সম্প্রতি নরসিংদীকে কেন্দ্র করে হওয়া ভূমিকম্পে ঢাকাসহ আশপাশের জেলাগুলো বড় ধরনের ঝাঁকুনি অনুভব করেছে। বাংলাদেশে ভূমিকম্প নিহত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভবনে ফাটল, মাটি ধসে যাওয়া ও স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত তিন দশকে বাংলাদেশে কোনো ভূমিকম্পে এত দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। এই ভূমিকম্প দেশের ভবন কাঠামো, নগর পরিকল্পনা ও জননিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়ছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ববিদ মেহেদি আহমেদ আনসারী জানান, বড় ভূমিকম্প সাধারণত ১৫০ বছর পরপর পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা থাকে। তাঁর মতে, ৭ মাত্রার ভূমিকম্প ফেরত আসার সময় এখন ঘনিয়ে এসেছে। তাই সাম্প্রতিক কম্পনকে সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখে সবাইকে প্রস্তুত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে ২০টি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ২ ডিসেম্বর লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে ৫.৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প রেকর্ড হয়। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় সর্বাধিক ৬টি ভূমিকম্প হয়—যা দক্ষিণাঞ্চলে সক্রিয় ভূমিকম্পীয় প্রবণতার ইঙ্গিত বহন করে।
বাংলাদেশে ভূমিকম্প :ঢাকায় তীব্র ঝাঁকুনি মানুষের আতঙ্ক
ভূমিকম্প আঘাত হানার সময় সকাল থাকায় অধিকাংশ মানুষ বাসায় ছিলেন। ১০টা ৩৮ মিনিটে নরসিংদীতে উৎপত্তি হওয়া এই ভূমিকম্প ঢাকায় প্রবল কম্পন সৃষ্টি করে। ভবন কাঁপতে থাকলে অনেক মানুষ বাসা, হাসপাতাল এবং বহুতল মার্কেট থেকে আতঙ্কে দৌড়ে বের হয়ে রাস্তায় আশ্রয় নেন। খোলা স্থানের ঘাটতির কারণে তারা সড়ক, গলি বা নীচতলায় দাঁড়িয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
নিকেতন এলাকার বাসিন্দা আশরাফুল আলম জানান, “সেলুনে বসে চুল কাটাচ্ছিলাম। হঠাৎ চেয়ার এত কাঁপছিল যে মনে হচ্ছিল পড়ে যাব। সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় বের হয়ে আসি।” তিনি মনে করেন, ঢাকা শহর ভূমিকম্পের জন্য মোটেও প্রস্তুত নয় এবং জীবন রক্ষার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।
কত মানুষ কম্পন অনুভব করেছেন—USGS-এর হিসাব
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, এ ভূমিকম্পে প্রায় ৭ কোটির বেশি মানুষ মৃদু কম্পন অনুভব করেছেন এবং আরও প্রায় ৬.৭ কোটি মানুষ হালকা ঝাঁকুনি পেয়েছেন। এটি ঝুঁকির দিক থেকে ‘কমলা শ্রেণি’তে অন্তর্ভুক্ত, যার অর্থ উল্লেখযোগ্য প্রাণহানি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে এটি ‘হলুদ শ্রেণি’, অর্থাৎ জিডিপির ১%–এর কম ক্ষতির ঝুঁকি।
শক্তিশালী কম্পন ঢাকায় ১ কোটির বেশি মানুষ অনুভব করেছেন। উৎপত্তিস্থল নরসিংদীতে প্রায় ৩ লাখ মানুষ তীব্র কম্পনের মুখোমুখি হন।
USGS আরও জানায়—
- ১৯৮৪ সালের ৬ মাত্রার ভূমিকম্পে ২০ জনের মৃত্যু
- ১৯৯৯ সালের ৫.২ মাত্রার ভূমিকম্পে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছিল
এগুলো অতীতের বড় ক্ষয়ক্ষতির দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
ঢাকার গঠনগত ঝুঁকি: কোন এলাকাগুলো সবচেয়ে বিপজ্জনক
রাজউকের ২০২4 সালের ‘আরবান রেজিলিয়েন্স’ প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে:
- ৮ লাখ ৬৪ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে
- দিনে ২ লাখ ২০ হাজার এবং
- রাতে ৩ লাখ ২০ হাজার মানুষের মৃত্যুঝুঁকি রয়েছে
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আকতার মাহমুদ জানান, ঢাকার নিম্নাঞ্চল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। পুরান ঢাকা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত উঁচু এলাকা হিসেবে ধরা হলেও প্রগতি সরণি, বালু নদীর পাশের অঞ্চল, পাশাপাশি হাজারীবাগ, শ্যামলী, ঢাকা উদ্যান, বছিলা, পূর্বাচল ও উত্তরার বড় অংশ নিম্নভূমি হিসেবে চিহ্নিত। এসব এলাকায় বালু ভরাট করে আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে—যা বড় ভূমিকম্পে সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বহন করে।

বাংলাদেশে ভূমিকম্প :করণীয় ,সচেতনতা জরুরি
ঢাকায় ভবনের চাপ, ঘনবসতি এবং খোলা জায়গার সংকট—সব মিলিয়ে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বহুগুণ বেশি। তাই জনসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভূমিকম্পের সময় করণীয়
- নিরাপদ স্থানে যাওয়ার চেষ্টা করুন
- দরজা–জানালা থেকে দূরে থাকুন
- লিফট এড়িয়ে সিঁড়ি ব্যবহার করুন
- খোলা জায়গা পেলে দ্রুত সরে যান
- মাথা ও ঘাড় সুরক্ষায় হাত বা বালিশ ব্যবহার করুন
ভূমিকম্পের পর করণীয়
- গ্যাস–বিদ্যুৎ লাইন পরীক্ষা করুন
- ফাটল দেখা গেলে ভবন ছাড়ুন
- গুজব নয়, সরকারি তথ্য অনুসরণ করুন
- প্রতিবেশীদের সাহায্য করুন
সাম্প্রতিক ভূমিকম্প আবারও প্রমাণ করেছে যে ঢাকা ভূমিকম্পের বড় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সঠিক নগর পরিকল্পনা, ভবন নির্মাণের নিয়ম মানা, খোলা জায়গা সংরক্ষণ এবং জনগণের সচেতনতা—এসবই বড় বিপর্যয় প্রতিরোধে ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে ভূমিকম্প বেড়ে যাওয়ায় এখনই প্রস্তুতি নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই।